-
info_outline Info
-
toc Table of Contents
-
share Share
-
format_color_text Display Settings
-
exposure_plus_1 Recommend
-
Sponsor
-
report_problem Report
-
account_circle Login
শিকলে বাঁধা স্বাধীনতার গল্প
-
ভূমিকা
-
আজকের আলোচনার সূচনা একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে করা যাক। ধরুন, একজন মানুষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারের ফাঁসির সেলে বন্দি। যেকোনো মুহূর্তে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতে পারে। অন্যদিকে, একটি গরুকে কুরবানির জন্য বেঁধে রাখা হয়েছে। নির্ধারিত দিনে তাকেও জবাই করা হবে।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে উভয়েই পরাধীন। উভয়েরই ভাগ্য যেন অন্য কারও হাতে নির্ধারিত। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই দুই অবস্থার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গরুটির পক্ষে নিজের মুক্তি সম্পর্কে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। অথচ মানুষটি মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতেও মুক্তির সম্ভাবনা কল্পনা করতে পারে। সে ভাবতে পারে হয়তো আদালতের রায় পরিবর্তন হবে, হয়তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমা মিলবে, হয়তো কোনো অলৌকিক ঘটনায় সে মুক্তি পাবে। বাস্তবে সে বন্দি হলেও তার চিন্তার জগৎ এখনও সম্পূর্ণ বন্দি হয়ে যায়নি।
তাহলে কি আমরা তাকে স্বাধীন বলব? উত্তর—না। কারণ কল্পনার স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতার সমার্থক নয়। সে কেবল চিন্তার জগতে স্বাধীন; বাস্তব জীবনে সে এখনও শিকলবন্দি। তবে এটুকু বলা যায় যে, অবলা প্রাণীটির তুলনায় তার স্বাধীনতার একটি অতিরিক্ত মাত্রা রয়েছে—চিন্তার স্বাধীনতা।
এই উদাহরণটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উপস্থিত করে—স্বাধীনতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? স্বাধীনতা কি কেবল শারীরিক বাধামুক্ত অবস্থার নাম, নাকি এর আরও গভীর কোনো অর্থ রয়েছে? রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কি মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়? নাকি স্বাধীনতার এমন কিছু অদৃশ্য শিকল আছে, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি এবং জীবনকে নীরবে নিয়ন্ত্রণ করে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
-
উপনিবেশের শিকল
-
আজ থেকে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। একসময় পৃথিবীর বিপুল জনগোষ্ঠী ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শক্তির শাসনের অধীনে ছিল। তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না; নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারও ছিল সীমিত। উপনিবেশবাদ কেবল একটি ভূখণ্ড দখলের প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও আত্মপরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে উপনিবেশবাদীরা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেনি। তারা এমন একটি 'নেটিভ অভিজাত' শ্রেণি গড়ে তুলেছিল, যারা জন্মসূত্রে উপনিবেশিত দেশের মানুষ হলেও চিন্তা ও মূল্যবোধে ছিল ইউরোপীয় শাসকদের প্রতিনিধির মতো। নির্বাচিত কিছু তরুণকে ইউরোপে শিক্ষা দেওয়া হতো, ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদর্শে গড়ে তোলা হতো, এবং পরে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে প্রশাসন, শিক্ষা ও সমাজ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হতো।
এভাবেই উপনিবেশবাদ কেবল বাহ্যিক শাসন হিসেবে নয়, মানুষের মনোজগতেও নিজের শিকড় বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার দাবি উচ্চারণকারী কণ্ঠস্বরও ছিল সেই উপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থারই সৃষ্টি। এখানেই উপনিবেশবাদের সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি নিহিত।
ঔপনিবেশিক শাসন কেবল ভূখণ্ড দখল করেনি; তারা মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়কেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় একটি শিক্ষিত 'নেটিভ অভিজাত' শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা একদিকে ইউরোপীয় মানবতাবাদের ভাষায় কথা বলত, অন্যদিকে সেই ভাষাকেই উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বটি ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র The Wretched of the Earth-এর ভূমিকা লিখতে গিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সার্ত্রের এই পর্যবেক্ষণ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে নিয়ে যায়। উপনিবেশ থেকে মুক্তি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হলেও, উপনিবেশিক চিন্তা ও মানসিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক কঠিন। অর্থাৎ, ঘুড়ি আমাদের আকাশে ঠিকই উড়তেছে কিন্তু নাটাই আমাদের হাতে নেই। তাই প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি কেবল শাসকের রূপ বদলেছে?
জঁ-পল সার্ত্র আরও বলেছেন, "তারা এখন আমাদেরই মানবতাবাদের ভাষায় আমাদের অমানবিকতার বিচার করছে।"
এই উক্তিটি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আমরা উপনিবেশ শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলাম এবং সে আওয়াজের দরুন আজকে আমরা উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন আসে যে, আমাদের প্রতিবাদের ভাষা কেমন ছিল?
আমাদের প্রতিবাদের ভাষাগুলো ছিল তাদেরই শেখানো। আমরা নিজেদের স্বাধীনতার আন্দোলনটুকুও নিজেদের ভাষায় করতে পারিনি। উপমহাদেশে হাজি শরিয়ত উল্লাহ, শহিদ তিতুমীর সহ যখন আলেম সমাজের আওয়াজকে ব্রিটিশরা যেভাবে কঠোর হস্তে দমন করেছিল সেভাবে নেটিভ অভিজাতদের আন্দোলনকে দমন করেনি। শেষমেশ নেটিভদের কাছে আত্মসমর্পন করেছিল। এই আত্মসমর্পণ টাও ছিল তাদের বিজয় এরই একটা অংশ মাত্র। কারণ তারা জানতো যে, এই নেটিভ অভিজাতরা আজকে বিজয়ী হলে বিজয়ী হবে তাদেরই সংস্কৃতি আর যদি নেটিভ ছাড়া অন্য কোনো সংস্কৃতি যেমন মুসলিমরা যদি বিজয়ী হয় তাহলে তাদের অস্তিত্ব ধরে রাখা কঠিন। আর ইউরোপীয়রা জানত যে, তারা যখন প্যারিস, লণ্ডন, আর্মস্টার্ডাম থেকে বলবে ‘Parthenon! Brother!’ তখন একই প্রতিধ্বনি শোনা যাবে সুদুর এশিয়া ও আফ্রিকার নেটিভ অভিজাতদের মুখে। এখানে “Parthenon” প্রাচীন Athens-এর সভ্যতা, যুক্তিবাদ ও ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। এখানে নেটিভরা ইউরোপের প্রক্সি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছে সেই প্রতিধ্বনির মাধ্যমে।
আবারও জ্যা পল সার্ত্রে বলছেন,
“আর বরাবরের মতই আমরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে বলতাম “আহা, একটু চেচামেচি করতে দাও না, শরীরের জ্বালাটা মিটে যাক! তারা কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করলেও তাদের কামড়ানোর যোগ্যতা নেই”। (Preface: The Wretched of the Earth)
এই বাক্য দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে তারা এমন নেটিভ তৈরি করেছে যাদের শুধু বিবৃতি দেওয়ার ক্ষমতাটুকুই রয়েছে এর বেশিকিছু নয়। আর তারা তো এমনটাই চেয়েছিল যেন যখন তারা আমাদের উপর বোমা বারুদ নিক্ষেপ করবে তখন যেন নেটিভরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদস্বরূপ বিবৃতি, মানববন্ধন নিক্ষেপ করে।
তাহলে আমরা কেমন স্বাধীনতার গল্পো শুনতে পাই? উপনিবেশ আমলে আমরা ছিলাম সেই বেধে রাখা কুরবানির গরুর মত। যার কোন স্বাধীনতা নেই। যাকে নির্ধারিত সময় কুরবানি করা হবে। এখন আমরা স্বাধীন হয়েছি সেই মানুষটির মত যে নানা রকম কল্পনা করে। বিভিন্ন উপায় খুজে চার দেয়াল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। কিন্তু তার মুক্তির জন্য সে অন্যের উপর নির্ভরশীল। যেখানে সে মুক্তির কল্পনা করেই নিজেকে শান্তনা দিতে পারে।
আজকে আমরা বুলি আওরাই যে আমরা স্বাধীন। কারণ আমাদের আছে একটি জাতীয় পতাকা, আমাদের আছে জাতীয় সংগিত, আমাদের একটি নির্বাচিত সরকার ইত্যাদি।
তবে এই ফাপাবুলিগুলো মুলত ঐ লোকটির চিন্তার জগতের মত। যেখানে সে কি চিন্তা করল বা না করল তাতে কারো কোন যায় আসে না। কিন্তু সেই কারাবন্দি লোকটি যদি কোনভাবে ফাসির সেল পালিয়ে যায় তাহলে হয়ত সে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হবে। সেজন্য রাষ্ট্র তাকে নিয়ে অনেক চিন্তিত। তাকে কঠোর নিরাপত্তা দিয়ে রাখে। কারাগারে তাকে মানসিক থেরাপি এমনভাবে দেওয়া হয় যেন সে ওই জীবনকেই নিরাপদ ভাবতে থাকে। তেমনি আমাদের রাষ্ট্রীয় মুল কাঠামো পশ্চিমাদের হাতেই নিহিত। আমাদের রাষ্ট্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রনের জন্য ডিপ স্টেট তাদের হাতে, আমাদের অথ্যনৈতিক নিয়ন্ত্রন তাদের হাতে, আমাদের বিচারব্যবস্থার আইনি কাঠামো তাদের হাতে গড়া। তারা আমাদের এমন এক গোলামীর শিকলে পরিয়ে রেখেছে যা আমাদেরকে 'সম্মানিত' গোলামে পরিনত করেছে। নেটিভ অভিজাতরা একসময় ইউরোপীয়দের আসামীর কাঠঘোরায় দার* করাতে পারলেও বর্তমানে পশ্চিমাদের হিংস্রতা বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদমুলক বিবৃতী দিতেও ভয় পায়। আমরা এমন এক সংস্কৃতি লালন করি যেখানে আরব, আফগান, উইঘুর, আরাকানের মুসলিমদের রক্ত, ভারতে মুসলিমদের মসজিদ সহ ধর্মীয় স্থানগুলো ধ্বংস করা সাধারণ বিষয় মাত্র। এখানে কোন প্রতিবাদের প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ না পশ্চিমারা কোনো বিবৃতি না দেয় ততক্ষণ আমাদের কিছুই করা যাবে না। কারণ তারাই তো আমাদের বলতে শিখিয়েছে পার্থেনন ব্রাদার। সুতরাং এই হচ্ছে আমাদের শিকলে বাধা সাধীনতা।
0 sponsors' commentsAfter each update request, the author will receive a notification!
smartphone100
→ Request update
Thank you for supporting the story! :)
Please Login first.
Reading Theme:
Font Size:
Line Spacing:
Paragraph Spacing:
Load the next issue automatically
Reset to default

